শুক্রবার | ১৮ অক্টোবর, ২০১৯
রাঙামাটি

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাড়া না পাওয়ায় থমকে আছে বরকলের ঠেগামুখে স্থল বন্দর স্থাপনের কাজ

প্রকাশঃ ২৫ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৫:০৫:১৬ | আপডেটঃ ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০৭:১২:২৮  |  ২৯১২
সিএইচটি টুডে ডট কম, রাঙামাটি। রাঙামাটির বরকল উপজেলার সীমান্তবর্তী ঠেগামুখ এলাকায় সরকার ২০১০ সনে স্থল বন্দর নির্মাণের উদ্যেগ নেয়, সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থলবন্দর চালু হলে লাভবান হবে প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত-বাংলাদেশ। তবে স্থল বন্দর নির্মাণ নিয়ে এলাকাবাসীর রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, কেউ বলছেন স্থলবন্দর হলে তারা বৈধভাবে ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারবেন, আবার কেউ উচ্ছেদ হওয়ার আশংকা প্রকাশ করেছেন। পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী কোন বড় ধরণের স্থাপনা করতে গেলে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের অনুমতি লাগে, কিন্তু আঞ্চলিক পরিষদ থেকে এখনো কোনো সাড়া না পাওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে স্থল বন্দর নির্মাণের কাজ।

রাঙামাটি শহর থেকে নৌপথের প্রায় ১শ কিলোমিটার দুরত্বে অবস্থিত বরকল উপজেলার ভূষনছড়া ইউনিয়নের থেগামূখ। এ থেগামুখের ওপারে রয়েছে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের দেমাগ্রি এলাকা। দুদেশের একমাত্র সীমানা হচ্ছে ভারতের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপত্তি কর্ণফুলী নদী । এ নদীর ওপর দিয়ে দুদেশের লোকজন নিজ নিজ দেশের পতাকার উড়িয়ে চলাচলসহ দুদেশের জেলেরা একই নদীতে মাছ শিকার করে থাকেন। আবার সীমান্তের উভয় পাড়ের বসবাসকারী জনগোষ্ঠী হচ্ছেন চাকমা সম্প্রদায়ের। তাদের মধ্যে ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি মিল রয়েছে। তাই তাদের মধ্যে প্রায়শঃই বিয়ে দেয়া নেয়াসহ আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি হওয়ার কারণে নেই কোন সংঘাত। এমনকি দেশের অন্য স্থানে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রতি মুহুর্তে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার মধ্যে থাকলেও পার্বত্য সীমান্তবর্তী উভয় পাড়ের মানুষের হৃদয়ের বন্ধনের প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে বিডিআর-বিএসএফ উভয়েরই।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সীমান্ত পাহারায় কখনো কখনো যান্ত্রিকতার চেয়ে হৃদয়বৃত্তিকেই প্রাধান্য দেন। আবার বিডিআর বিএসএফএর মধ্যে সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ রাখতে প্রায়ই আয়োজন করা হয় প্রীতি ভলিবল খেলা ও পতাকা বৈঠক। এ থেগামুখ এলাকায় একটি বাজার রয়েছে। এই বাজারকে কেন্দ্র করে দুই শতাধিক পরিবারের বসবাস রয়েছে। কিন্তু এসব পরিবারের বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র প্রকট। খাবার পানি হিসেবে কুয়ার পানি পান করতে হচ্ছে তাদের। তাছাড়া সেখানকার অধিবাসীদের জন্য নেই টেলিফোন নেটওয়ার্ক ও পর্যাপ্ত নৌযানসহ যোগাযোগের বিকল্প কোন মাধ্যম। অপরদিকে ভারতের ডেমাগ্রি এলাকার দিকে তাকালে দেখা যায় সেখানে বিদ্যূৎ, রাস্তাঘাট ও টেলিফোন নেটওয়ার্কসহ নাগরিক সকল সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তাছাড়া কর্ণফুলী নদীর দুধারে রয়েছে মন পাগল করা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। যা সহজেই যে কোন পর্যটককে আকৃষ্ট করবে।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে ও স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০১০ সনে তৎকালীন সরকার রামগড় ও ঠেগামুখে দুটি স্থল বন্দর স্থাপনের উদ্যেগ নেয়, তার ধারাবাহিকতা ২০১২ সনে তৎকালীন নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান ঠেগামুখ প্রস্তাবিত স্থলবন্দর এলাকা পরিদর্শন করেছেন।  তাছাড়া দুই দেশের সরকারী উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঠেগামুখ এলাকা পরিদর্শন এবং ভারত সরকার মালামাল আনা নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতের দেমাগ্রি এবং ঠেগামুখ খালের  উপর ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ব্রীজ নিমার্নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ স্থল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে বাঁশ, কাঠ, চূনা পাথর ও স্টিলের পণ্য বাংলাদেশে আসবে আর বাংলাদেশ মেলামাইন সামগ্রী,পানির ফিল্টার,প¬াস্টিক সামগ্রী, জুতা,শীত বস্ত্র এবং বিভিন্ন ব্রান্ডের সিগারেট ও চিপস ভারতে যাবে।


আর এসব বিষয়গুলোকে কাজে লাগিয়ে সরকার ২০১০ সনে বরকলে ঠেগামুখে স্থল বন্দর নির্মাণের উদ্যেগ নেয়, পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী ভুমি অধিগ্রহণ ও বড় স্থাপনা নির্মানে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ থেকে অনুমতি লাগে, আঞ্চলিক পরিষদে আবেদন করে গত ৮ বছরেও অনুমতি মেলেনি। স্থল বন্দর করতে সাড়ে ৭ একর জমি প্রয়োজন আর এক্ষেত্রে ২০/২২টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে।

এলাকার অধিবাসী কিরন চাকমা জানান, জানান, স্থল নির্মানের জন্য সরকার ৮ একর জমি অধিগ্রহণ করলে কমপক্ষে ২০ পরিবার উচ্ছেদ হওয়ার আশংকা রয়েছে। তবে উচ্ছেদের তালিকায় থাকা এসব পরিবার বলছেন সরকার যদি নায্য ক্ষতিপুরণ ও পূর্নবাসনের ব্যবস্থা গ্রহন করলে তাদের জায়গা জমি ছেড়ে দিতে কোন আপত্তি নেই  বলে জানিয়েছেন।  

ব্যবসায়ী প্রভাত কুমার চাকমা জানিয়েছেন ঠেগামূখে স্থল বন্দর চালু নিয়ে বেশ দ্বিধাদ্বন্ধে ও উদ্ধিগ্নে রয়েছেন। কারণ এ স্থল বন্দর চালু হলে স্থানীয় লোকজন ব্যবসা-বাানিজ্য করার সুযোগ পাবে কিনা এবং সীমান্তের উভয় পাড়ের মানুষের মধ্যে বিয়ে দেয়ানেয়াসহ যে আত্বীয়তার বন্ধন রয়েছে তার ফাটল ধরবে কিনা। তবে তারা চান দেশের অর্থনীতি উন্নয়ন স্বার্থে, ব্যবসা-বানিজ্যর দোয়ার খুলতে এবং সর্বোপরি এলাকার উন্নয়নের জন্য ঠেগামুখে স্থল বন্দর চালু হোক।

ঠেগামুখ বাজারের দোকানদার  অরুন জ্যোতি চাকমা জানান, বর্তমানে আমরা দুদেশের লোকজন আত্বীয়তা বা বিয়ের আনানেয়ার সূত্রে অবাধে এপার-ওপারে যাতায়াত করতে পারছি। কিন্তু স্থল বন্দরটি চালু হলে আত্বীয়তা ভেঙ্গে যাবে কিনা তার জন্য আমরা  যথেষ্ট দ্বিধাদ্বন্ধ ও উদ্ধিগ্নে রয়েছি। তবে আমরা চাই এখানে স্থল বন্দর হোক।     



বড়গাঙ (ঠেগামুখ) ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি কামিনী চাকমা জানান, স্থল বন্দর না হওয়াতে বর্তমানে আমরা চুরি করে ভারতে যেতে হয় তার জন্য হয়রানিরও শিকার হচ্ছি। স্থল বন্দর হলে বৈধভাবে  ভারতে যেতে পারবো এবং বৈধভাবে ব্যবসা-বানিজ্য করতে পারবো। তার মতে স্থল বন্দর চালু হলে এখানকার এলাকার অর্থনীতির চাঙ্গা হওয়ার পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নতি ঘটবে। তবে স্থল বন্দর করার আগে এলাকার চেয়ারম্যান, হেডম্যান, কার্বারীসহ সকলের সাথে কথা বলে করা উচিত বলে মন্তব্য করেন।

বরকল ভুষণছড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ মামুন জানান, ঠেগামুখে স্থল বন্দর হলে দুই দেশ লাভবান হবে। যত দ্রুত সম্ভব স্থল বন্দর নির্মাণ কাজ চালু হওয়া দরকার।

বিজিবির ঠেগামুখ ক্যাম্পের ভরপ্রাপ্ত অধিনায়ক শাহাদাত ও উপ-ক্যাম্প অধিনায়ক মাসুদ বলেন, সীমান্ত এলাকায় দু’দেশের মানুষ সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। দু’দেশের মানুষের মধ্যে অপ্রীতিকর তেমন কিছুই ঘটে না। তা ছাড়া যে কোনো বিষয়ে কোনো রকম সমস্যা দেখা দিলে তা বিজিবি-বিএসএফসহ উভয় পাড়ের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে আলোচনায় সমাধান দেয়া হয়ে থাকে। সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে বিজিবি-বিএসএফ উভয়ে সব সময় সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।  



চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় বলেছেন, কাপ্তাই বাঁধের ফলে অনেক পাহাড়ী পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে উদ্বাস্ত হয়ে যাযাবর দিন যাপন করছে। স্থল বন্দর হলে অনেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমরা স্থল বন্দরের বিপক্ষে নই কিন্তু সরকারের উচিত স্থানীয় সার্কেল চীফ, আঞ্চলিক পরিষদ, হেডম্যান, কার্বারীসহ স্থানীয়দের আলাপ করে ১০/১৫ বছর হাতে সময় নিয়ে কাজ করা। যদি তা করে তাহলে সমস্যা হবে না, কিন্তু এক তরফা যদি করা হয় তাহলে এখানে আতংক দেখা দিবে, সংঘাত হবে, স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

বিষয়টি নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাঙামাটির জেলা প্রশসাক একেএম মামুনুর রশীদ জানান, স্থল বন্দর নিয়ে জেলা প্রশাসনে কোন তথ্য নেই, তাই তারা স্থল বন্দর সর্ম্পকে কিছু বলতে পারছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন সহকারি পরিচালক জানান, পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য এলাকায় কোন স্থাপনা করতে গেলে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের অনুমোদন লাগে, আমরা আঞ্চলিক পরিষদকে চিঠি দিয়েছি কিন্তু এখনো কোন উত্তর পায়নি। এখনো পর্যন্ত আঞ্চলিক পরিষদের কোন সাড়া না পাওয়ায় স্থল বন্দর স্থাপনের কাজ ঝুলে আছে।

তবে সাধারন মানুষের মতে বরকলের ঠেগামুখে স্থলবন্দর হলে রাঙামাটি জেলার জুড়াছড়ি, বিলাইছড়ি এবং বরকল উপজেলা মানুষের আর্থ সামাজিক রাস্তাঘাট, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে।

বিশেষ প্রতিবেদন |  আরও খবর
এইমাত্র পাওয়া
আর্কাইভ
সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত, ২০১৭-২০১৮।    Design & developed by: Ribeng IT Solutions