বৃহস্পতিবার | ১৩ অগাস্ট, ২০২০
রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক

আলাউদ্দিন স্যার এর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি : সফিকুল ইসলাম

প্রকাশঃ ১৩ জুলাই, ২০২০ ০৯:১৪:২২ | আপডেটঃ ১৩ অগাস্ট, ২০২০ ০৮:৫৭:৪১  |  ৩৪৩
বিত্ত-বৈভব কে না চায়। নগর জীবনে ছোট্ট একটি ফ্ল্যাট, স্বচ্ছন্দের জন্য একটি গাড়ি আর যাপীত জীবনকে রাঙ্গাতে ব্যাংকে জমানো বেশ কিছু টাকা- পরিপাটি গোছানো এমন জীবন সবাই চাই এবং যেভাবেই হোক না কেন, অনেকই তা পেয়েও যায়। কিন্তু একটি পেশার খাঁটি কিছু মানুষ আছেন, যারা এসব কিছুর উর্ধ্বে। আর তারা হলেন শিক্ষক, শিক্ষাগুরু বা জীবনের পথ প্রদর্শক।

অকাতরে নিজের জীবনের সেরা সময় ব্যয় করে যারা মানুষ তৈরী করেন, তারা নিজের বা নিজ সংসারের স্বার্থের কথা বেমালুম ভুলে যান। দায়িত্ববোধ আর কঠিন পেশাদারিত্বের মাঝে ঢাকা পড়ে যায় জীবনের খুঁটিনাটি পাওয়া না পাওয়ার কাব্য। কখনো কঠিন, কখনো বা পরম মমতায় যিনি জীবন যুদ্ধে জয়ী হবার প্রথম মন্ত্র শিখিয়ে আমাদের প্রস্তুত করেন তিনি আর কেউ নন, একজন নিবিদিত প্রান শিক্ষক।

তেমনি এক শিক্ষাগুরুর আজ(১৪ জুলাই) প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী, যিনি এই পাহাড়ী জনপদ, প্রকৃতি আর স্বচ্ছ নীলহ্রদের প্রেমে পড়ে কাটিয়ে দিয়েছেন পুরোটা জীবন। হ্যাঁ, বলছি রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এবং রাঙ্গামাটি জেলার প্রাক্তন জেলা শিক্ষা অফিসার জনাব মোঃ আলাউদ্দিন স্যারের কথা।

গত বছর এই দিনে বার্ধক্যজনিত রোগে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বনানী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হ। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

সেই ১৯৪৯। বাবার হাত ধরে স্যারের পাহাড় কন্যা রাঙামাটিতে আসা। যে শহরে আজ আমাদের পদচারণ সে শহরে নয়, কাপ্তাই লেকে ডুবে যাওয়া পুরনো রাঙামাটিতে। তার পিতা জনাব মোঃ আবুল কাশেম ছিলেন রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক । সর্বজন শ্রদ্ধেয় কাশেম স্যার ছিলেন গণিতের পন্ডিত হিসেবে খ্যাতিমান। চির সবুজ পাহাড় আর পাহাড়ের মানুষের সারল্যের মাঝে খুঁজে পেয়েছিলেন সাদাসিধে জীবন এবং চিরশান্তি।

রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র মোঃ আলাউদ্দিন শিক্ষা জীবন শেষে ১৯৬৮ তে একই স্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তারপর একটানা ৩০ বছর এই স্কুলে তিনি শিক্ষাদান করেছেন।  শুধু পাঠদান নয়, খেলাধুলা, বিজ্ঞান মেলা সহ অন্যান্য প্রতিভা বিকাশ মূলক কর্মকান্ডে সব সময় করেছেন ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ। প্রিয় স্কুল ছেড়ে ২০০০ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন কাপ্তাইয়ের নারানগিরি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে রাঙামাটি জেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৩ সালে কর্ম জীবনের ইতি টানেন।
পিতার মতই ভালোবাসতেন রাঙামাটিকে। শিক্ষকতায় নিবেদিতপ্রাণ এ মানুষটি তাঁর কর্মজীবনের পুরোটাই কাটিয়েছেন প্রিয় রাঙামাটিতে। আলোকবর্তিকা হিসেবে জ্ঞানের আলো বিলিয়েছেন রাঙামাটির স্নেহাস্পদ অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে; যাদের অনেকেই আজ দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। আত্মীয়-স্বজনের অনুরোধ বা রাজধানীর স্বনামধন্য স্কুলে বদলির সুযোগ পাশ কাটিয়েছেন শুধু রাঙামাটির টানে। এই শহরের প্রতি তাঁর এই অকৃত্রিম ভালোবাসা  সত্যিই অনন্য।

মূলত, সমাজ অন্ধকার রাতের সাথে তুলনীয়। এখানে প্রকৃতি জগতের মতো কোন সূর্য ওঠে না। সমাজে জ্ঞানের আলো, বিজ্ঞানের আলো, মানবতার আলো, সাম্যের আলো, ভ্রাতৃত্বের আলো, ন্যায়ের আলোসহ বিভিন্ন আলোয় আলোকিত করে শিক্ষিত মানুষ। প্রকৃতির রাজ্যের সাথে মনুষ্য সমাজের পার্থক্য গড়ে দেয় এই আলোর প্রদীপসম মানুষেরা। অনাদি কাল থেকে যিনি এই প্রদীপ জ্বালিয়ে যাচ্ছেন তিনি হচ্ছেন শিক্ষক। সমাজের বাতিঘর। আর তেমনি নিষ্ঠাবান মানুষ গড়ার কারিগর প্রয়াত এই শিক্ষাগুরুর প্রতি জানাই আমাদের ঐকান্তিক কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধা।


লেখক: সফিকুল ইসলাম, গণমাধ্যম কর্মী, ঢাকা।

মুক্তমত |  আরও খবর
এইমাত্র পাওয়া
আর্কাইভ
সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত, ২০১৭-২০১৮।    Design & developed by: Ribeng IT Solutions