শনিবার | ০৬ জুন, ২০২০
রাঙামাটির

চিকিৎসকের রিপোর্টে মৃত সন্তান নার্সের সহযোগিতায় জীবিত প্রসব লাভ করলো

প্রকাশঃ ২০ মে, ২০২০ ০৪:৩৫:৫৪ | আপডেটঃ ০৬ জুন, ২০২০ ০৬:০৩:৩৩  |  ৩৯২৭
সিএইচটি টুডে ডট কম, রাঙামাটি। মা ও শিশু কেন্দ্রের চিকিৎসকের অবহেলা আর আলট্রাসনোগ্রাফী রিপোর্টে মৃত সন্তানটিতে নার্সের সহায়তায় জীবিত সন্তান প্রসব করলো মা, নবজাতক ও মা দু’জনেই সুস্থ্য রয়েছে।

জানা গেছে, সন্তান জন্ম দেয়ার সম্ভাব্য তারিখে নানিয়াচর চৌদ্দ মাইল এলাকা থেকে স্ত্রী মিনতি প্রভা চাকমাকে নিয়ে গত ১৭ সোমবার রাঙামাটি মা ও শিশু হাসপাতালে আসেন স্বামী তরুন চাকমা। চিকিৎসক লেলিন চাকমা করোনা ভাইরাসের কারণে নানা অজুহাত তুলে ধরে পরে আলট্রাসনোগ্রাফী রিপোর্ট দেখে বললেন, আপনার সন্তানটি গর্ভাস্থায় মারা গেছে, আমাদের কিছু করার নেই, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে মৃত সন্তানটি বের করতে হবে। একথা বলে তিনি প্রসুতি নারীকে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে রেফার করেন।

পরে প্রসুতি নারীর স্বামী  তাকে নিয়ে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করায়, দুপুরে উিউটি করে যাওয়া এক সিনিয়র নার্স রাতে দায়িত্ব পালন করা নার্সকে ফোন দিয়ে খবরাখবর জানতে চাইলে তিনি জানান, এক রোগীকে এসেছে তার রিপোর্ট মৃত শিশুর কথা বলা হয়েছিলো, কিন্তু মহিলার হিমোগ্লোবিনের পরিমান কম থাকায় এক ব্যাগ রক্ত দেয়ার কথা বলেছি, কিন্তু মহিলাটির স্বামী রক্ত ম্যানেজ করতে না পারায় বাধ্য ডিউটিরত সিনিয়র নার্স সুমিত্রা বড়–য়া নিজেই রক্ত দেন। পরের দিন ১৮ মে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নার্সের ডিউটি থাকায় তিনি নিজে হাসপাতালে যান এবং হ্যান্ড ওভার নেন, এক পর্যায়ে সকাল ৯টায় প্রসুতি নারীর ব্যাথা শুরু হয়, তখন তাকে লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নার্স জানান, আমরা মৃত সন্তান হলে তাকে প্লেটে রাখি আর জীবিত হলে কোলে নেই বা মায়ের পাশে রাখি, যেহেতু আলট্রসানোগ্রাফী রিপোর্টে মৃত বলা হয়েছিল আমাদের প্রস্তুতি সে রকমই ছিলো, কিন্তু প্লেটে রাখার পর হঠাৎ বাচ্ছাটি নড়ে উঠে, তাড়াতাড়ি নাড়ি কেটে দেই এবং নাড়ি কেটে রিসাসিটেশান শুরু করে দিলাম, প্রায় দুইমিনিট পরে বাচ্চা জোরে কেঁদে উঠল,আমি খুশিতে কাদব নাকি হাসব বুঝতে পারছিলাম না।পরে আমরা পরিস্কার করে মা’র কাছে দেই।



ওই নার্স আরো জানান, আমাদের হাত দিয়ে অনেক নরমাল এবং সিজারে ডেলিবারি করেছি, এমন ঘটনা ঘটেনি, আনন্দে আমার চোখে পানি চলে আসে, একজন মাকে তার সন্তানকে জীবিত অবস্থায় ফেরত দিতে পেরেছি।

নার্সটি ফেবুকে আবেগে ষ্টাটাস দিলেও পরে ব্যাক্তিগত আইডি থেকে ষ্টাটাসটি মুছে ফেলেন,  তবে ডিপ্লোমা  নার্সিং গ্রুপে তার ষ্টাটাসটি শেয়ার করা হয়, এতে বলা হয়,

"আমি সাধারনত তেমন কোন কিছু পোস্ট করিনা কিন্তু আজ বলতে গেলে বিবেকের তাড়নায় পোস্ট দিচ্ছি, ভাবছি আজ যদি এই বিষয়টা আমি ফেইসবুকে তুলে না ধরি তবে নিজের কাছে নিজেকে আমি ক্ষমা করতে পারবোনা।যাক এবার বলি তাইলে,গতকাল রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে বিকাল ৫;৪৫ মিনিটে মিনতি প্রভা চাকমা, বয়স-২৮ বছর, ড/ঙ-তরুন চাকমা, চোদ্দ মাইল, নানিয়ারচর,নামে একজন গর্ভবতী মা ভর্তি হন। উনি প্রথমে রাঙামাটি গঈডঈ তে যান পরে ওখানকার দায়িত্ব প্রাপ্ত ডাক্তার গর্ভবতী মাকে চেক আপ করেন এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পরে বাচ্চা পেটের ভিতর মারা গেছে বলে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে রেফার করেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে ডিউটিরত নার্স সব রিপোর্ট চেক করে যখন দেখলেন হিমোগ্লোবিন কম সাথে সাথে এক ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় রুগির হাসব্যন্ডকে কিন্তু বিকেল বেলায় উনারা কোথাও ব্লাড না পাওয়াতে পরে ডিউতিরত অবস্থায় সিনিয়র স্টাফ নার্স সুমিত্রা বড়ুয়া নিজেই ব্লাড দিলেন, যথা সময়ে ডিউটি শেষ করে উনি বাসায় চলে যান, রাতের ডিউটিতে আসেন এশিকা চাকমা, উনিও সারারাত রুগির পাশে বসে ছিলেন কারন মরা বাচ্চা শুনে রুগি মানসিক ভাবে ভেঙে পরেছেন। তারপর আজ সকালে আমি ডিউটিতে এসে রুগির হ্যান্ড ওভার নিই। সকাল নয়টা বাজে যখন লেবার পেইন বেড়ে যায় এবং পিভি করে দেখি ফুল ডাইলেটেশন হয়ে গেছে তখনি উনাকে লেবার টেবিলে শুইয়ে দিলাম এবং ইঞ্জেকশন অক্সিটোসিন দিয়ে ইন্ডাকশন শুরু করে


দিলাম, সকাল এগারটা বিশ মিনিটে যখন ছেলে বাচ্চা ডেলিভারি হল তখন দেখি বাচ্চাটা শ্বাস নিচ্ছে, এখানে একটি কথা বলে রাখি মরা বাচ্চা বিধায় আমি ফিটাল হার্ট সাউন্ড শুনিনি। যখনি দেখলাম বাচ্চা শ্বাস নিচ্ছে আমি তাড়াতাড়ি মায়ের বুকে বাচ্চা রেখে ড্রাই করে নাক মুখ পরিস্কার করে দিলাম এবং নাড়ি কেটে রিসাসিটেশান শুরু করে দিলাম, প্রায় দুইমিনিট পরে বাচ্চা জোরে কেদে উঠল,আমি খুশিতে কাদব নাকি হাসব বুঝতে পারছিলাম না, বার বার শুধু ভগবান বুদ্ধকে ডাকছিলাম, বাচ্চাটা যেন বেচে যায়। শেষ পর্যন্ত বাচ্চাটা বেচে গেল, সামান্য মিকোনিয়ান স্টেইন্ড হওয়ার কারনে ভর্তি দিয়েছি শিশু ওয়ার্ডে। সবাই বাচ্চাটার জন্য আশির্বাদ, দোয়া করবেন।




এখন আমার কথা হল. এই যে আমাদের শ্রদ্ধেয় ডাক্তারগন যদি এভাবে ভুল রোগ নির্ণয় করেন তাইলে আমরা নার্স এবং সাধারন মানুষ কোথায় গিয়ে দাড়াবো? এখানে মরা বাচ্চা বলে জীবিত বাচ্চা ডেলিভারী করায় বাচ্চার বাবা আমাকে পায়ে ধরে প্রনাম করেছেন চোখে ছিল আনন্দশ্রু, কিন্তু যদি আল্ট্রাসনোগ্রামে বাচ্চা জীবিত বলে যদি মরা বাচ্চা ডেরিভারী হত সেক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা কি হত একবারো ভেবে দেখেছেন কেউ??? এমনিতেই চিকিৎসক এবং নার্সদের উপর সাধারন জনগনের ক্ষোভের অন্ত নেই, সেই জায়গায় আমরা সাস্থ্য কর্মীরা যদি এরুপ ভুল কার্যক্রম করি তাইলে আমাদের প্রতি সমাজের সর্ব সাধারণের ক্ষোভ বাড়তেই থাকবে। আমি শ্রদ্ধেয় ডাক্তারগণদের বিনীত অনুরোধ করছি যাতে ভুল রিপোর্ট করা না হয় সেদিকে সবাই নজর দিবেন।"



নবজাতকের মা মিনতি প্রভা চাকমা অশ্রুশিক্ত নয়নে বলেন, আমার সন্তান মৃত শোনে আমি পৃথিবীতে ছিলাম না, এত কষ্ট করে পেটে ধরে যদি দু:সংবাদ শুনতে হয় কার ভালো লাগে বলেন? করোনা ভাইরাস আতংকের মধ্যে নার্সরা জীবন বাজি রেখে আমার এবং সন্তানের জন্য যা করলো আমি তাদের ঋণী। তবে ডাক্তাররা যেন ভুল রিপোর্ট না দেয়, জীবিত মানুষকে এভাবে মেরে না ফেলে সেদিকে প্রশাসনের  লক্ষ্য রাখা উচিত।
নবজাতকের পরিবার হাসপাতালের গাইনী বিভাগে রয়েছেন। 

এদিকে রাঙামাটি মা ও শিশু কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা লেনিন তালুকদারের বিরুদ্ধে অবহেলার কারনে রোগী মারা যাওয়ার অভিযোগ পুরানো। ২০১৪ সনে জুরাছড়ি থেকে প্রসুতি নারী মা ও শিশু কেন্দ্রে ভর্তি হওয়ার ডাক্তারের অবহেলা কারণে মহিলাটি মৃত সন্তান প্রসব করে। ২০১৭ সনে উক্ত চিকিৎসকের ভুলে জেনি আক্তার (২৫) নামে এক প্রসূতি মা ও তার গর্ভের সন্তানের মুত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করে তার স্বজনরা। এছাড়া তার কাছে যাওয়া রোগীদের নানা অজুহাতে রেফার করতেন প্রাইভেট হাসপাতালে আর কেউ না গেলে চিকিৎসা করতেন না। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।


এদিকে বিষয়টি সর্ম্পকে বক্তব্য নিতে কয়েক দফায় ডা লেনিন তালুকদারকে ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

রাঙামাটি |  আরও খবর
এইমাত্র পাওয়া
আর্কাইভ
সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত, ২০১৭-২০১৮।    Design & developed by: Ribeng IT Solutions