সোমবার | ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯
ঢাকায় চুক্তির ২২ বছর পুর্তিতে সংবাদ সম্মেলন

চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় জুম্ম জনগণকে তাদের করণীয় নিয়ে ভাবতে হবে : সন্তু লারমা

প্রকাশঃ ০১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৫:৪২:০৫ | আপডেটঃ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১২:০১:৩৮  |  ১৭৯৪
সিএইচটি টুডে ডট কম, রাঙামাটি। জুম্ম জনগণ ২২ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন অপেক্ষা করেছে। জুম্ম জনগণ সরকার তথা শাসকগোষ্ঠীকে অনেক সময় দিয়েছে। জুম্ম জনগণ সকল ক্ষেত্রে দুর্বলতর ও পশ্চাৎপদ। তাই বলে তারা অবহেলা ও উপেক্ষার পাত্র হতে পারে না। জুম্ম জনগণ অধিকারকামী ও মুক্তিকামী। আর এটাই তাদের একমাত্র সম্বল। এমনিতর ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতিতে পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণ তাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর। জুম্ম জনগণ সমঅধিকার ও সমমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায়। তাই পার্বত্য অঞ্চলে বিরাজমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তারা আজ গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে তাদের করণীয় কি হতে পারে বলে বলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২২ বছরপূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির উদ্যোগে ১ ডিসেম্বর ২০১৯, রোববার, সকাল ১১ টায় ঢাকার হোটেল সুন্দরবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে জনসংহতি সমিতির সভাপতি এমন বক্তব্য তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। জনসংহতি সমিতির শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদকত উ উইন মং জলি-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মেসবাহ কামাল ও অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধিদলের প্রধান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অধিবাসীদের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। শান্তিপূর্ণ ও শোষণ-নিপীড়ন মুক্ত একটা নিরাপদ জীবন পাওয়ার আশায় পার্বত্যবাসীরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে তাঁকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল বলে তিনি জানান।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২২ বছর অতিক্রান্ত হলেও সরকার চুক্তির মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ অবাস্তবায়িত অবস্থায় রেখে দিয়েছে। বলাবাহুল্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যেই সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত হয়েছিল সেই আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বর্তমানে এক নাগাড়ে ১১ বৎসর ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে কোন কার্যকর পদক্ষেপ ও উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। পক্ষান্তরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিসহ জুম্ম জাতিসমূহের জাতীয় অস্তিত্ব চিরতরে বিলুপ্তির ষড়যন্ত্র অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।

চুক্তি স্বাক্ষরকারী আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ ১১ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নে এগিয়ে না আসার কারণে জুম্ম জনগণ তথা পার্বত্যবাসীর মধ্যে একদিকে চরম হতাশা, অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে আর অন্যদিকে নিরাপত্তাহীন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। চুক্তি মোতাবেক বহিরাগত সেটেলারদেরপার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন প্রদান না করে এবং পার্বত্য চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ অবাস্তবায়িত রেখে সরকার উল্টো ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে অব্যাহতভাবে অসত্য, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন প্রচারণা দেশে বিদেশে চালিয়ে যাচ্ছে। “চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক”, “পার্বত্য চুক্তি শতভাগে বাস্তবায়ন করা হবে”, “চুক্তির অবশিষ্ট বিষয়সমূহ পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হবে” মর্মে বিগত এগার বছর ধরে সরকার কেবল প্রতিশ্রুতি প্রদান করে কালক্ষেপণ করে চলেছে বলে শ্রী লারমা জানান।

সন্তু লারমা আরো জানান, বস্তুত সরকার জুম্ম জাতিসমূহকে চিরতরে নির্মূলীকরণের হীন উদ্দেশ্যে যুগপৎ বাঙালিকরণ ও ইসলামীকরণের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে চলেছে। এই উদ্দেশ্যে একই সাথে শাসকদল এবং সরকার ও সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, প্রতিরক্ষা বিভাগএর একটা বিশেষ মহল চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করা, জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বকে ধ্বংস করা ও চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গৃহীত সকল কার্যক্রম প্রতিরোধ করার সর্বাত্মক অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সর্বোপরি ক্ষমতাসীন দল ও সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় নেতৃত্ব সশস্ত্র তাঁবেদার ও দালাল বাহিনীসহ সাম্প্রদয়িক গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ যোগসাজশে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী কর্তৃক পার্বত্য অঞ্চলে অবৈধ গ্রেপ্তার ও জেলে প্রেরণ, গুম ও প্রাণহানি, ক্যাম্পে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ খোঁজার নামে তিন পার্বত্য জেলায় জলপথে ও স্থল পথে জনগণকে নানাভাবে হয়রানিকরণ, অশালীন আচরণ, গ্রামাঞ্চলে তল্লাসী অভিযান, ধরপাকড় ইত্যাদি জোরদার করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ ২২ বছর অপেক্ষা করেও পার্বত্যবাসীর আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করে দেওয়া হলো না। সেটি আজ সুদূরপরাহত। এটি পার্বত্যবাসীরা কখনও ভুলতে পারে না। অগণিত মানুষের তাজা রক্ত আর অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা, অকল্পনীয় নির্যাতন, নিপীড়ন, দমন-পীড়ন, শোষণ-বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিনিময়ে অর্জিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি জুম্ম জনগণ বৃথা যেতে দিতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের নীতি পরিহার করে পার্বত্য চুক্তিকে পদদলিত করে, বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে, পার্বত্যবাসীর জমি বেদখল করে, জুম্ম জনগণকে স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ করে, সামরিক উপায়ে দমন পীড়নের মাধ্যমে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল পথ রুদ্ধ করে, জনসংহতি সমিতির সদস্যদের মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত ও ফেরারী করে এবং নেতৃস্থানীয় সদস্যদের বন্দী ও জীবনহানি করে, জুম্ম জনগণকে নানা মিথ্যা অভিযোগে জিম্মি করে আর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সদস্যদের সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ আখ্যা দিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের নামে যে কোন ধরনের চক্রান্ত দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কখনই শুভ ফল বয়ে আনতে পারে না।

সংক্ষিপ্ত আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন, বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও আরো ৭৮টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ আছে। তারা চায় তাদের মৌলিক অধিকার, সমঅধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। সুতরাং রাজনৈতিকভাবে সমাধান করার জন্যই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হয়েছিল। তিনি সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলে বলেন, দীর্ঘ ২২ বছর পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে ঠিক কত বছর পর বাস্তবায়ন হবে?

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক উ উইন মং জলি প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়।

রাঙামাটি |  আরও খবর
এইমাত্র পাওয়া
আর্কাইভ
সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত, ২০১৭-২০১৮।    Design & developed by: Ribeng IT Solutions