শনিবার | ১৭ নভেম্বর, ২০১৮
অনুসন্ধানী রিপোর্ট::

পুনাতি ত্রিপুরা কি আঞ্চলিক সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের বলি ?

প্রকাশঃ ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১২:৫৬:২৩ | আপডেটঃ ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০৭:৪৫:১৪  |  ৮২৯
সিএইচটি টুডে ডট কম, খাগড়াছড়ি। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা নয়মাইল ত্রিপুরা পল্লীতে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী পুনাতি ত্রিপুরা কৃত্তিকা হত্যাকান্ডের নৈপথ্যে আঞ্চলিক পাহাড়ী সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের জের থাকতে পারে বলে ধারণা বিভিন্ন মহলের। মূলত, নয়মাইল এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজী ও ক্ষমতা প্রদর্শনের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়রা। কিন্তু প্রকৃত রহস্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে পুলিশ।

স্থানীয় ও পুলিশের সূত্র বলছে, পুনাতি হত্যাকান্ড মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ৫ জনের মধ্যে নজরুল ইসলাম, শাহ আলম, মনির হোসেন ও আরেক মনির হোসেনকে রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু ঘটনার সাথে তাদের সম্পৃক্ততার কোন প্রমাণ বের করতে পারেনি। ঘটনার দিন(২৮ জুলাই) দুই মনির হোসেনসহ পুনাতি ত্রিপুরার মামা বিভূতি রঞ্জন ত্রিপুরা সন্ধ্যা পর্যন্ত নয়মাইল পাড়ায় বসে মদ পান করে। সন্ধ্যার পর নজরুল ইসলাম ও শাহ আলম গাঁজার একটি চালান দীঘিনালায় পার করে দেয়ার আশায় পুনাতির মামার দোকানে অবস্থান নিয়েছিল। যে যার কাজ শেষ করে চলে যায়। রাতে বাড়ির আশপাশে খোঁজাখুজি করতে গিয়ে পুনাতির মৃতদেহ পাওয়ার পর স্থানীয়রা তাদের সন্দেহ করে অভিযুক্ত করে। হত্যাকান্ডের ১ মাস ৪ দিন পর গত ১ সেপ্টেম্বর জেএসএস এমএন লারমা সমর্থিত যুব সমিতি দীঘিনালা শাখার সদস্য বরেন্দ্র ত্রিপুরা ওরফে শান্ত গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঘটনা ভিন্ন দিকে মোড় নিতে থাকে। ঘটনার দিন বরেন্দ্র ত্রিপুরা নয়মাইল এলাকায় জেএসএস’র কালেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিল এবং ঘটনার পরপর সে নয়মাইল থেকে গা ঢাকা দিয়ে দীঘিনালা সদরে চলে যায়। এছাড়া শান্তকে নয়মাইলে পোস্টিং করার আগে আটমাইল এলাকায় নারী কালেঙ্কারীর অভিযোগ ছিল। অভিযোগের দায়ে তাকে পোস্ট পোস্টিং করে নয়মাইলের দায়িত্ব দেয় সংগঠন। শান্তকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে জেএসএস এমএন লারমা। তার মুক্তির দাবিতে গত ১ সেপ্টেম্বর দীঘিনালায় চার ঘন্টা সড়ক অবরোধ করে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। কেবল পিনাতি হত্যাকান্ড নয়, খাগড়াছড়ি সদরে ইউপিডিএফ কর্মী বিনয় চাকমা হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে শান্ত’র বিরুদ্ধে।

অবরোধ চলাকালে দীঘিনালার হলুদ চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে দীঘিনালা থানার ওসি আব্দুস সামাদের বিরুদ্ধে ইউপিডিএফকে সহযোগীতা করার অভিযোগ তুলে তাঁর অপসারণ এবং শান্ত’র নি:শর্ত মুক্তি দাবি করা হয়। কিন্তু পুনাতি ত্রিপুরা হত্যাকা-ের সাথে তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে ধারণা থেকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৪ সেপ্টেম্বর তাকেও দুই দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এদিকে, পুনাতি ত্রিপুরার পরিবারকে খাগড়াছড়ি সদরের গাছবান এলাকায় নিয়ে সাক্ষাত করেছে ইউপিডিএফ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ইউপিডিএফর সাথে পুনাতির পরিবারের সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও সংগঠনটির কোন নেতা এবিষয়ে কথা বলেননি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রমতে, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা নয়মাইল আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট। দীঘিনালা, বাঘাইছড়ি, লংগদু উপজেলা থেকে খাগড়াছড়িসহ সারাদেশে যোগাযোগের একমাত্র সড়কপথ এটি। যেকোন পণ্য পরিবহন থেকে নয়মাইলে প্রতিদিন চাঁদা আদায় করা হয়। ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামে ইউপিডিএফ’র উপ-দল আত্মপ্রকাশের পর থেকে নয়মাইল এলাকায় আধিপত্য হারায় ইউপিডিএফ। এরপর বিভিন্ন ভাবে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় নতুন কৌশলে এগোচ্ছে দলটি। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা সমীকরণ চলছে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কোন না কোন পক্ষ এমন নির্মমতা করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।  

পুনাতি হত্যাকান্ড সর্ম্পকে ইউপিডিএফ সংগঠক অংগ্য মারমা বলেন, ইউপিডিএফ জন্মলগ্ন থেকে গণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কাউকে ধর্ষণ করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করার পক্ষে ইউপিডিএফ সমর্থন করে না। ধর্ষণের মতো ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে তিনি বলেন, ইউপিডিএফ নয়মাইল এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করতে পারছে না অনেকদিন ধরে। এমন পরিস্থিতিতে ইউপিডিএফর বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙ্গুল তোলা অমূলক।
পার্বত্য অধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান মাঈন উদ্দিন বলেন, ইতি চাকমা হত্যাকা-ের মতো পুনাতি ত্রিপুরা হত্যাকা-ের সাথে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা সম্পৃক্ত। কিন্তু অতীতের মতো বিনা বিচারে বাঙালীদের হয়রানি ও দোষারূপ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও নিরপরাধ লোকজনকে অবহতি দেয়ার অনুরোধ করেন।

দীঘিনালা থানার অফিসার ইনচার্জ ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ বলেন, ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশে অনেকদূর অগ্রগতি হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পুলিশের হাতে এসেছে। এতে ধর্ষণের আলামত পাওয়া না গেলেও যৌন নির্যাতন করে পুনাতি ত্রিপুরাকে হত্যা করা হয়েছে নিশ্চিত হয়েছে মেডিকেল টিম। পুনাতির মা অজ্ঞাত আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের পর স্থানীয়দের ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুলিশ ইতোমধ্যে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে ৪ জনকে রিমা-ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকা- সর্ম্পকে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। সবশেষ শান্তকে রিমা-ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে পুলিশের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ জুলাই রাতে দীঘিনালার নয়মাইল ত্রিপুরা পল্লী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পড়–য়া পুনাতি ত্রিপুরা কৃত্তিকার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার প্রতিবাদে খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ করে সচেতনমহল।


বিশেষ প্রতিবেদন |  আরও খবর
এইমাত্র পাওয়া
আর্কাইভ
সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত, ২০১৭-২০১৮।    Design & developed by: Ribeng IT Solutions